সহজ যুক্তিতে চিন্তা করলে যেকোনো বইয়ের পেছনে থাকা জ্ঞান ও চিন্তাধারার উৎস স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। কোরআনের বিভিন্ন বক্তব্য এবং তৎকালীন মানুষের মহাবিশ্ব সম্পর্কিত ভুল ধারণার দিকে তাকালে বোঝা যায়, এগুলো তৎকালীন রূপকথা ও সমসাময়িক ধারণা সংগ্রহ করেই গঠিত হয়েছে। নিচে কয়েকটি স্পষ্ট উদাহরণ ও যুক্তি তুলে ধরা হলো:
১. সূর্য জলাশয়ে অস্ত যাওয়ার দাবি:
কোরআনে বলা হয়েছে, জুলকারনাইন সূর্যকে একটি পঙ্কিল জলাশয়ে বা কাদাযুক্ত পানির মধ্যে অস্ত যেতে দেখেছেন। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান স্পষ্ট করে যে, সূর্য একটি বিশাল নক্ষত্র যা পৃথিবী থেকে বহুগুণ বড় এবং তা কোনো নির্দিষ্ট জলাশয়ে বা কাদায় ডুবে যাওয়ার সুযোগ নেই। এটি তৎকালীন মানুষের খালি চোখে দৃশ্যমান দিগন্ত সম্পর্কিত ভুল ধারণার প্রতিফলন মাত্র।
২. সমতল পৃথিবীর ধারণা (বিছানা স্বরূপ):
কোরআনে পৃথিবীকে "বিছানা" বা বিছিয়ে রাখা সমতল বস্তু হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এটি তৎকালীন সমতল পৃথিবী (Flat Earth) বিশ্বাসের সাথে সম্পূর্ণ মিলে যায়।
৩. পাহাড়কে পেরেকের সাথে তুলনা:
কোরআনে বলা হয়েছে, পৃথিবীকে পাহাড়-পর্বত দিয়ে পেরেকের মতো গেঁথে স্থির রাখা হয়েছে যেন তা একদিকে হেলে বা কেঁপে না যায়। কিন্তু আধুনিক ভূ-বিজ্ঞান ও টেকটোনিক প্লেটের তথ্য অনুযায়ী, পাহাড় মূলত টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষে সৃষ্টি হয় এবং এগুলো পৃথিবীকে স্থির রাখার মতো কোনো "পেরেক" বা নোঙর নয়।
৪. সমতল বিশ্বাসের মহাকর্ষীয় ভুল:
যেহেতু সমতল বস্তু কাত হয়ে যাওয়ার বা উল্টে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাই তৎকালীন ভাবনায় পৃথিবীকে পেরেক মেরে স্থির রাখার ধারণা কাজ করেছিল। কিন্তু পৃথিবী গোলকাকৃতি হওয়ায় এবং মহাকর্ষ বলের মাধ্যমে নিজ কক্ষে আবর্তিত হওয়ায় এটি কখনো "একদিকে হেলে পড়া"র সম্ভাবনা নেই। এটি প্রমাণ করে, তৎকালীন রচয়িতা মহাকর্ষ বল বা পৃথিবীর গোলকীয় গতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিলেন।
৫. বিজ্ঞানের কোনো মৌলিক আবিষ্কারের অভাব:
যদি এই গ্রন্থে বিজ্ঞানের বিশাল তত্ত্বই নিহিত থাকত, তবে ইতিহাস বা আধুনিক যুগে কোনো মুসলিম বিজ্ঞানী কোরআন গবেষণার মাধ্যমে একটি মৌলিক আবিষ্কার (এমনকি একটি সুতা তৈরির বিজ্ঞানও) করতে পারলেন না কেন? আধুনিক বিজ্ঞানের যত বড় বড় আবিষ্কার—সবই হয়েছে মহাকাশবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান ও প্রযুক্তির গবেষণাগারে, যা ইউরোপের মুক্তচিন্তক, নাস্তিক ও অন্যান্য বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ের হাত ধরে এসেছে।
৬. আধুনিক মহাজাগতিক ও পদার্থবিজ্ঞানের মৌলিক ধারণার অনুপস্থিতি:
যদি এটি মহাবিশ্বের প্রকৃত স্রষ্টার বাণী হতো, তবে এতে আমরা অভিকর্ষ (Gravity), স্পেস-টাইম (Space-time), দৈর্ঘ্য সংকোচন (Length contraction), আলোকবর্ষ, ব্ল্যাক হোল, ডার্ক ম্যাটার কিংবা অ্যান্টি-ম্যাটারের মতো বৈজ্ঞানিক সত্যের কোনো ধারণাই পাই না কেন?
৭. দিন-রাত ও আরশের ধারণা:
আমরা জানি, চাঁদ ও পৃথিবীর নিজস্ব কক্ষপথে ঘূর্ণন এবং পৃথিবীর নিজ অক্ষের ওপর আবর্তনের কারণেই দিন-রাত এবং গ্রহণ ঘটে। সূর্য গ্রহণ হলেও সূর্যের নিজস্ব আলো কখনো নিভে যায় না; কেবল চাঁদ মাঝে এসে আলো আটকে দেয়।
কিন্তু কোরআনিক গল্পে বলা হয়, সূর্য নাকি গিয়ে আল্লাহর আরশের নিচে সেজদা করে বা থামে, যার পর আলো বন্ধ হয়ে রাত হয়! এটি তৎকালীন সেই ভুল ধারণাকেই প্রকাশ করে যেখানে ভাবা হতো—পৃথিবী স্থির এবং সূর্য পৃথিবীকে এক পাক ঘুরে কোনো এক জায়গায় গিয়ে থামলে রাত নেমে আসে।
উপসংহার:
যেখানে মহাবিশ্ব তার নিজস্ব মহাকর্ষ ও নির্দিষ্ট নিয়মে অবিরাম ঘুরে চলেছে, সেখানে সূর্য আরশের নিচে গিয়ে থেমে রাত হওয়ার গল্প সম্পূর্ণ হাস্যকর। সত্যি যদি কোনো মহাজাগতিক নিয়ন্তা এই গ্রন্থ পাঠাতেন, তবে মহাবিশ্ব সম্পর্কিত মৌলিক বিজ্ঞানের বিষয়ে এমন অজ্ঞতা প্রকাশিত হতো না। এটি স্পষ্ট নির্দেশ করে যে, তৎকালীন অজ্ঞতা ও রূপকথা মিলেই এই সমস্ত ধারার জন্ম।